41478

খোঁপায় প্রতিবাদের ফুল

বিশেষ প্রতিবেদন
বাস, ট্রেন বা চলার পথে যে লোকটি অচেনা মেয়েটির গায়ে হাত দেয়, আচ্ছা তারও তো মা, বোন, ভাগনি, ভাইঝি, স্ত্রী বা প্রেমিকা রাস্তায় যাতায়াত করেন। আপনি হাত দিচ্ছেন অন্যজনের সম্মানে, মনে রাখবেন অন্যজন ঠিকই আপনার সম্মানেও হাত দিচ্ছে। ঐ মেয়েটি বাসায় ফিরে যেমন বোবাকান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে, দেখুন আপনারও কেউ দরজার ওপারে হাউমাউ করে চোখের জল ফেলছে। তাই নারীকে সম্মান দিন, নিজেও ভালো থাকবেন।

যেখানেই দেখবেন নারীর সঙ্গে অশোভন কিছু হচ্ছে, সেখানেই প্রতিবাদ করুন। অনেকেই শুনছি বলেন, নারীরাতো এখন ক্ষমতায়! আচ্ছা একবার ভাবুনতো, আপনার মা কিংবা বোন আপনি ছাড়া কতটা অসহায়? তাহলেই বুঝবেন ক্ষমতায় থেকেও কিছু কাপুরুষের জন্য নারীরা কতটা ভয়ে থাকেন। সম্প্রতি একটি লেখা আলোচনার কেন্দ্রে। গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না।

প্রতিবাদের এই ভাষা পুরুষদের যতটা সতর্ক করবে, তার থেকে অনেক বেশি লজ্জা দিচ্ছে। বাসে একজন পুরুষ অন্য পুরুষের গা ঘেঁষে দাঁড়ালে বিরক্ত হয়ে বলেন, সরে দাঁড়ান। তাহলে একজন নারীর কেমন বিরক্ত লাগে একবার ভাবুন। আর এই বিষয়টাই খোঁপার কাঁটায় গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না লিখে বোঝাতে চেয়েছেন জিনাত জাহান। কেন লিখেছেন, শুনুন তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা।

‘বাসের মধ্যে একজন বয়স্ক লোকের হাতের থাবা যখন বুঝতে পারলাম, তখন প্রতিবাদ করলাম। এ প্রতিবাদে বাসের অন্য যাত্রীরা ছিলেন চুপ। ভাবটা এমন—সব দোষ তোমার। একপর্যায়ে আমাকেই চুপ করে থাকার পরামর্শ দিলেন। সব মিলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লাম। চারুকলায় পড়াশোনা করার ফলে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে লেখা ও আঁকাকেই সব সময় বেছে নিয়েছি। এবারও নিজের একটি খোঁপার কাঁটাতেই লিখলাম, ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’। ফেসবুকে পোস্ট দিলাম, দেখলাম বাসের মধ্যে যে পুরুষেরা এ ধরনের কাজ করেন তারা মানতে পারলেন না। সম্প্রতি একটি টি-শার্টে একই কথা লেখার পরও একই অবস্থা হয়েছে।’

জিনাত জাহানরা চার ভাইবোন। নিজেদের ডাকনামের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের ব্যবসা উদ্যোগের নাম বিজেন্স। বিজেন্সের এ খোঁপার কাঁটা ও টি-শার্ট তুমুল আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। ফেসবুকে টি-শার্টে লেখা ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ কথা বিকৃত করে একটি গোষ্ঠী নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, অনেকে শুধু এ কথাটি লিখেই ফেসবুকে নিজের প্রোফাইল পিকচার করছেন।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি থেকে বিজেন্স পারিবারিক উদ্যোগ হিসেবে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশীয় পণ্য বিক্রি করছে। জিনাত জাহানের মতে, খোঁপার কাঁটা বা টি-শার্টগুলোর মূল উদ্দেশ্য ব্যবসা নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই সচেতনতামূলক এ কথা লেখা হয়েছে। এ কাঁটা বা টি-শার্ট গায়ে দিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না তা নয়। শুধু মানুষকে বার্তাটা গ্রহণের আহ্বান করা হয়েছে।

জিনাত বললেন, ‘তিন বোনের এক ভাই তানজীদ শুভ’র ভাবনা থেকেই এবার টি-শার্ট করা হয়েছে। সে প্রথমত পুরুষ, তারপর আমাদের ভাই। আর এই টি-শার্ট শুধু মেয়েরা গায়ে দেবে তা নয়, ছেলেরাও পরবে। এটি শুধু প্রতিবাদের একটি মাধ্যম।’

টি-শার্ট প্রসঙ্গে জিনাতের বক্তব্য, ফেসবুকে অনেকেই বলার চেষ্টা করছেন, নারীরা বাসে না চড়লেই পারেন। এখানে কিন্তু তা বলা হয়নি। নারীরা ভিড়ের মধ্যে বাসে যাতায়াত করবেন। তবে এই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কেউ নারীদের গা ঘেঁষে নোংরামি করতে পারবে না।

যত বাধাই আসুক, পারিবারিক সহায়তায় পরিচালিত এ ব্যবসা উদ্যোগ থেকে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সচেতনতামূলক বার্তা নিয়ে গয়না বা পোশাক বানানোর কাজ চলমান থাকবে বলেও জানিয়ে দিলেন জিনাত।

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *